প্রসঙ্গ: শুভ-অশুভ বিতর্কে মহালয়া-র আগেই দুর্গাপূজার উদ্বোধন।।
বাংলা ও বাঙালীর স্ব-ঘোষিত "অভিভাবক"- এর অন-লাইন প্রকাশনা এবেলা.ইন (https://ebela.in/durga-puja/how-to-wish-in-mahalaya-dgtl-1.877932) এ বছর একটা বিতর্ক জুড়েছে - মহালয়া শুভ নাকি অশুভ। "অভিভাবক" তাঁর নিরীহ সন্তান বাঙালীকে শেখানোর চেষ্টা করেছে "how to wish in mahalaya"!!!! যদিও, 19 সেপ্টেম্বর, 2017, 1:31 AM-এ (ইংরেজী সংখ্যাগুলো অপরিবর্তিত রাখলাম) এবেলা-র ফেসবুক পেজ জানাচ্ছে: "এবেলা.ইন এর তরফ থেকে সবাইকে শুভ মহালয়া!" বাণিজ্যের লক্ষ্মীলাভে একমাত্র "বাজার"-ই যাঁদের "আনন্দ"-এর কারণ, তাঁদের কাছে বাজারে যেটার কাটতি হবে সেটাই তাঁরা করবেন।
যাইহোক, এবার মহালয়া প্রসঙ্গ। "মহালয়া" শব্দের আক্ষরিক সমার্থ "আনন্দ নিকেতন"। এই মহালয়া অবশ্য একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। যেহেতু, ধর্ম-চর্চার প্রয়োজন আমার খুব একটা নেই, তাই এ ব্যাপারে আমার আগ্রহও সামান্যই। কিন্তু, বাজার-সরকারের ছুঁড়ে দেওয়া বিতর্কে যোগ দিতে হলো; ওই "শাস্ত্র-মতে" আর কি!
কথিত আছে, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা প্রতিপদ থেকে আশ্বিনের কৃষ্ণা পঞ্চদশী (অমাবস্যা) - এই সময়ে প্রেতলোক থেকে পিতৃপুরুষের আত্মারা নিজেদের ছেড়ে যাওয়া প্রিয়জনের মায়ায় ঘরে (আলয়) ফিরে আসেন। মনে রাখতে হবে, শাস্ত্রের নিয়ম তারিখ মেনে চলে না; চলে তিথি মেনে। এককালে, আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষ বা পিতৃপক্ষের প্রত্যেকটা দিনেই পিতৃপুরুষকে শ্রদ্ধাসহকারে অন্নজল নিবেদন করার রীতি চালু ছিলো। যাইহোক, এই মহালয়ার তিথিতেই নাকি সকল পিতৃপুরুষের আত্মার আগমন সম্পুর্ন হয়। তাই, এই ক্ষণে তর্পণ-এর মাধ্যমে তাঁদের পরিতৃপ্ত করা হয়। এর ফলে, প্রতিটা আলয় আনন্দময় (মহময়) হয়ে ওঠে। আর, আনন্দ-ই যেহেতু শুভ; কাজেই মহালয়া-কে "শুভ" বললে দোষের কী?
শাস্ত্র মেনে মহালয়াতে যাঁরা গঙ্গায় অঞ্জলি দেন, তাঁরা কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত কিছুর জন্যই প্রার্থনা করেন; তাঁদের তর্পণ সকলকে উদ্দেশ করে। শাস্ত্র বলছেন - "যেযাং ন মাতা ন পিতা ন বন্ধু" - অর্থাৎ, যাঁর মাতা-পিতা-বন্ধু কেউ নেই; আজ তাঁকেও স্মরণ করছি। শাস্ত্র আরও বলেছেন: "যে-অবান্ধবা বান্ধবা বা যেন্যজন্মনি বান্ধবা" - অর্থাৎ, যাঁরা জন্ম-জন্মান্তরে যাঁরা আমার আত্মীয়-বন্ধু ছিলেন অথবা, কখনো আমার বন্ধু ছিলেন না; তাঁরা সকলেই আমার অঞ্জলি গ্রহণ করুন। এইভাবেই, মহালয়া সমস্ত ধর্ম-বর্ণ-আত্মীয়-অনাত্মীয়ের গন্ডী পার করে সর্বজনীন হয়ে ওঠে। এই সার্বজনীনতাকে শুভ বললে দোষের কী?
শাস্ত্র মতে, বিয়ে-যজ্ঞ-গৃহপ্রবেশ-অন্নপ্রাশন বা যে কোনো শুভ কাজের ক্ষেত্রেই প্রয়াত পূর্বপুরুষ সহ সমস্ত জীব-জগতের উদ্দেশে তর্পণ করতে হয়; অঞ্জলি দিতে হয়। অর্থাৎ, শুভ কাজের সাথে তর্পণ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। রামায়ণে পড়া যায়, লঙ্কা বিজয়ের আগে রামও নাকি এমনটাই করেছিলেন। সে যাই হোক, আসলে মহালয়ার মতো উৎসব অত্যন্ত প্রাচীন এক ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কৃতি; এক বিশ্বাস যা স্মরণাতীত কাল থেকেই প্রচলিত।
অবশ্য, এই বিশ্বাসকে আজ ভাঙতেই হবে। যদি পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা হয়, আর সেটাই যদি বাঙালীর দুর্গোৎসবের নির্ঘন্ট নির্ধারণ করে; তবে পূজার বাণিজ্যিকীকরণ আর পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য সময়টা কিন্তু নেহাতই কম। মাত্র দশটা দিন!
তাই, মহালয়ার "মিথ" ভেঙে, তাকে শুভ-অশুভের বিতর্কে ধাঁধিয়ে দিয়ে; পুজোর সময়টা আরেকটু বাড়িয়ে নিলে বাজারেরই লাভ। আবার, পুজোর আনন্দে মেতে যদি মানুষ আরও ক'টা দিন তাঁর জীবনের প্রতিদিনকার সমস্যা ভুলে; মোহের আবেশে আবিষ্ট হয়ে থাকেন, তবে তো বাজারীরও লাভ। এই বাজার আর বাজারীর অনুপ্রেরণাতেই তাই মহালয়ার আগেই দুর্গাপূজার "উদ্বোধন"!!!!
@pradipsinterpretations